অধ্যায় আটাশি: তিনটি সোনালি রেখা, সর্বোত্তম শ্রেণির আধ্যাত্মিক সঞ্চয়ী ওষুধ
দ্রব্য প্রস্তুতির পাত্রের ভেতরে একটি সম্পূর্ণ গোলাকার ওষুধ ধীরে ধীরে আকৃতি নিচ্ছিল। তার গায়ে ছিল অপূর্ব দীপ্তি, সেখান থেকে ঝলমল করছিল অজস্র তারা-জ্যোতি। ইতোমধ্যেই তিনটি স্পষ্ট রেখা গড়ে উঠেছে, এবং তার মাঝে আবছা সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ে রেখাগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎই সেই ওষুধ কাঁপতে কাঁপতে মৃদু গুঞ্জন তুলল, নিমিষেই রেখাগুলো সোনালি রঙে রূপান্তরিত হলো। একই সঙ্গে, ঘন সুবাসিত এক ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল, যেন তা স্পর্শযোগ্যই বটে। ওষুধটি বাতাসে ভেসে উঠল; চু ইয়ান তা হাতে নিয়ে দেখল, তখনো তাতে স্পর্শ করলে তাপ অনুভব করা যাচ্ছিল।
কিন্তু চু ইয়ান মোটেও বিচলিত হলো না। সে মাথা নিচু করে ওষুধটির দিকে তাকাল, চোখেমুখে এক অনির্বচনীয় উল্লাসের ছায়া ফুটে উঠল। তারপর ঠোঁটে এক চওড়া হাসি খেলে গেল, সে আনন্দে বলে উঠল, ‘‘এ তো...’’
‘‘তিনটি সোনালি রেখা—এ তো শ্রেষ্ঠ মানের জুউলিং ওষুধ!’’
তিনদিন তিনরাতের নিরন্তর সাধনার পর অবশেষে চু ইয়ান শ্রেষ্ঠ মানের সোনালি জুউলিং ওষুধ তৈরি করতে পারল। ত্রিশ ভাগ উপাদান থেকে মাত্র একটি ওষুধই এমন মানের তৈরি হল।
এ থেকেই স্পষ্ট, শ্রেষ্ঠ মানের ওষুধ তৈরি কতটা দুষ্কর—এটি নিছক কৌশল নয়, প্রকৃতি, পরিবেশ, ভাগ্য—সবকিছুই একত্রে থাকতে হয়।
‘‘শুধু এই একটি শ্রেষ্ঠ মানের ওষুধের দামই কয়েকটি সাধারণ মানের ওষুধের সমান।’’
চু ইয়ান আপনমনে বলল।
নিশ্চয়ই, এমন ওষুধ সে সস্তায় কাউকে দেবে না। নিজের শক্তি বাড়ানোর জন্যই এ রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
তার ওপর, তার ওষুধ তৈরির সাফল্যের হার এত বেশি যে, অর্থাভাব তার নেই।
‘‘ত্রিশ ভাগ উপাদান থেকে মোট পনেরটি সাধারণ মানের, দশটি উন্নত মানের ও একটি শ্রেষ্ঠ মানের ওষুধ তৈরি হয়েছে—সাফল্যের হার এখনও নব্বই শতাংশের কাছাকাছি।’’
চু ইয়ান সামনে সাজানো বোতলগুলোর দিকে তাকিয়ে আনমনে শরীর মেলাল।
শ্রেষ্ঠ মানের জুউলিং ওষুধ প্রস্তুতির চেষ্টা না করলে, তার সাফল্যের হার আরও বেশি হতো।
‘‘এই ওষুধ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে আমি মূল কৌশলগুলো আয়ত্ত করেছি। যদি অন্য ওষুধের রেসিপি পাই, তবে সেগুলোও তৈরি করার চেষ্টায় নামতে পারি।’’
চু ইয়ান নিজে নিজে বলল। ওষুধবিদ্যা নিয়ে সে থেমে থাকতে চায় না, বরং নানা পরীক্ষার মাধ্যমে আরও এগোতে চায়।
জুউলিং ওষুধ কেবলমাত্র প্রাথমিক স্তরের, এর প্রস্তুতিতে বিশেষ জটিলতা নেই। প্রকৃত দক্ষতা অর্জনের জন্য নিরন্তর সাধনা প্রয়োজন।
শ্রুতি আছে, কোনো এক অতিপ্রতিভাবান ওষুধ প্রস্তুতকারক পাহাড়-পর্বতকে চুল্লি আর মাটির আগুনকে শিখা বানিয়ে, তার তৈরি ওষুধের সুবাস কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে দিতেন।
সেই দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব।
এমন সময়, প্রস্তুত কক্ষ থেকে সতর্কবার্তার শব্দ শোনা গেল।
‘‘এবার বেরিয়ে পড়া যাক। এই সাধারণ ওষুধগুলো বিক্রি করে কিছু রূপা তুলে নেব, উন্নত ও শ্রেষ্ঠ মানেরগুলো নিজের জন্য রেখে দেব।’’
চু ইয়ান ওষুধগুলো গুছিয়ে নিয়ে প্রস্তুত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল।
খুব অল্প সময় পরে সে সুন সিলির কাউন্টারে পৌঁছাল। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই সুন সিলি হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, ‘‘ভাই, কাজ শেষ? এবার কী পেলেন?’’
‘‘মোটামুটি।’’
চু ইয়ান হালকা মাথা নাড়ল।
এরপর সে তিনটি জেডের শিশি বার করল। তাতে ছিল পনেরটি সাধারণ মানের জুউলিং ওষুধ।
‘‘এ কী?’’
সুন সিলির চোখে বিস্ময় খেলে গেল। সে শিশিগুলো হাতে নিয়ে খুলল।
এক মুহূর্তেই গাঢ় সুবাস বেরিয়ে এল।
সুন সিলির বুক ধড়ফড় করে উঠল; সে চমকে চু ইয়ানের দিকে তাকাল, ‘‘এসবই সাধারণ মানের? সবই আপনি বানিয়েছেন?!’’
ওষুধগুলো দেখে তার মুখে অবিশ্বাসের ছায়া। যদি এগুলো সব চু ইয়ানই বানিয়ে থাকে, তবে তার প্রতিভা সাধারণ ধারণার বাইরে।
‘‘আমার জন্য দাম নির্ধারণ করে দিন।’’
চু ইয়ান নির্লিপ্ত।
‘‘অবশ্যই!’’
সুন সিলি শিশিগুলোয় নাক ডুবিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বলল, ‘‘পনেরটি সাধারণ মানের জুউলিং ওষুধ—মোট অষ্টাদশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা কেমন?’’
‘‘চলবে।’’
চু ইয়ান দর কষাকষি না করে সোজা রাজি হয়ে গেল।
তার তো তেমন খরচ নেই; ওষুধ তৈরি করা তার কাছে লাভের ব্যবসা।
লেনদেন শেষ হলে চু ইয়ান রৌপ্য তুলে নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হল।
হঠাৎ, তার কিছু মনে পড়ল। সে ফিরে তাকাল সুন সিলির দিকে।
সুন সিলি তৎপর, চু ইয়ান ফিরে তাকাতেই জিজ্ঞেস করল, ‘‘ভাই, কিছু বলবেন?’’
চু ইয়ান মাথা নাড়ল, ‘‘হ্যাঁ, একটি বিষয় জানতে চাই।’’
‘‘ওহ!’’
সুন সিলি গম্ভীর হয়ে বুকে হাত রাখল, ‘‘বলুন ভাই, যা জানতে চান খুলে বলুন, আমি যেখানে জানি, সেখানেই বলব।’’
চু ইয়ান একটু ইতস্তত করে বলল, ‘‘আপনার কাছে কি ওষুধ তৈরির রেসিপি বিক্রি হয়?’’
‘‘রেসিপি?’’ সুন সিলি কিছুটা অবাক হয়ে চু ইয়ানের দিকে তাকাল, বলল, ‘‘আপনি কি নতুন কোনো ওষুধ বানাতে চান?’’
‘‘হ্যাঁ।’’
চু ইয়ান গোপন করল না।
‘‘এ কী!’’ সুন সিলি মাথা নাড়ল, ‘‘ভাই, আপনি তো সদ্য ওষুধবিদ্যায় হাত দিয়েছেন। বেশি কিছু একসাথে শেখা ঠিক নয়, বরং ভালোভাবে জুউলিং ওষুধেই দক্ষতা বাড়ান।’’
চু ইয়ান কিছু বলল না।
সে তো ইতিমধ্যে শ্রেষ্ঠ মানের জুউলিং ওষুধ তৈরি করতে পারছে; তার আর কিসের অনুশীলন?
সুন সিলি চু ইয়ানের নিরুত্তর দেখে ভাবল, সে হয়তো আঘাত পেয়েছে। দ্রুত বলল, ‘‘হা হা, অবশ্য আপনার মতো প্রতিভাবান আরও কিছু শিখতে চাইতেই পারেন।’’
‘‘তবে, আমাদের দোকানে ওষুধের রেসিপি বিক্রি হয় না।’’
‘‘তাই নাকি...’’
চু ইয়ান শুনে কপাল কুঁচকাল, চলে যেতে উদ্যত হল।
‘‘এই! যান না!’’
এসময় সুন সিলি আবার ডাকল, ‘‘আপনি যদি সত্যিই রেসিপি কিনতে চান, আমি আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারি।’’
‘‘আচ্ছা?’’
চু ইয়ানের মন আনন্দে ভরে উঠল, সে ঘুরে তাকাল, ‘‘এটা সত্যি?’’
‘‘নিশ্চয়ই, তবে...’’ সুন সিলি মাথা নাড়ল, একটু ভেবে বলল, ‘‘এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, এখনই যাওয়া যাবে না, কাল সকালে আসুন।’’
‘‘তাহলে কাল গেটের বাইরে একসাথে যাবো, কেমন?’’
‘‘হ্যাঁ, কথা দিলাম!’’
চু ইয়ান খুশি মনে রাজি হল।
ওষুধের রেসিপি পেতে সময় লাগলেও তার আপত্তি নেই।
‘‘তাহলে ভাই, আমি এবার যাই!’’
বলেই চু ইয়ান সশ্রদ্ধে অভিবাদন জানিয়ে চলে গেল।
... ...
ওষুধের দোকান ছেড়ে বেরিয়ে সে সোজা নিজের গুহায় ফিরে গেল। পুরোনো অভ্যাসমতো প্রবেশ করল দেবদেবীর মন্দিরে এবং সাধনায় বসে পড়ল।
এক রাত কেটে গেল।
পরদিন চু ইয়ান চুক্তি অনুযায়ী মন্দিরের গেটের কাছে এল।
এর আগে সে নিবন্ধন করিয়ে বেরোনোর অনুমতি নিয়েছিল।
‘‘ভাই, সুপ্রভাত! অপেক্ষা করালাম, দুঃখিত।’’
এসময় সুন সিলি ছুটে এসে হাত নেড়ে ডাকল।
‘‘কোনো অসুবিধা নেই, আমিও সদ্য এসেছি।’’
চু ইয়ান মৃদু হাসল।
‘‘ঠিক আছে... তবে মনে রাখবেন, রেসিপি কিনতে গেলে যথেষ্ট রৌপ্য সঙ্গে রাখবেন। দাম কম নয়।’’
‘‘ধন্যবাদ, ভাই।’’
চু ইয়ান হাসল। এখন তার যথেষ্ট সঞ্চয় আছে; কয়েকটি রেসিপি কিনতে অসুবিধা হবে না।
তারপর সে প্রশ্ন করল, ‘‘তবে, ভাই, কোথায় রেসিপি বিক্রি হয়?’’
সুন সিলি চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘‘শান্ত থাকুন, এখানে বেশি কথা বলার দরকার নেই।’’
‘‘চলুন, বাইরে গিয়ে বলি।’’
সে সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ দেখল।
চু ইয়ান মুখে কিছু না জানিয়ে মাথা নাড়ল, ‘‘ঠিক আছে।’’
এরপর দুজন গেটের বাইরে রওনা হল।
গেটের সামনে পাহারাদাররা তাদের অনুমতিপত্র দেখে যেতে দিল।
এরপর তারা বেরিয়ে এসে পৌঁছাল আকাশমেঘ নগরীতে।
‘‘ভাই, আমার সঙ্গে আসুন।’’
সুন সিলি খুবই সতর্ক, বারবার চারপাশে নজর রাখছিল।
চু ইয়ানও সতর্কভাবে তার পিছু নিল।
সুন সিলি তাকে নিয়ে গলিপথ ধরে বাঁয়ে, ডানে ঘুরতে লাগল, যেন কোনো রহস্যময় গোলকধাঁধায় ঢুকেছে।
একটি নির্জন গলির কাছে পৌঁছে, সুন সিলি চু ইয়ানকে একটি জেডের চাকতি দিল, ‘‘ভাই, এটা রাখুন।’’
‘‘এটা কী?’’ চু ইয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘‘এটা রূপান্তরকারী জেড। সক্রিয় করলে মুখাবয়ব ও উপস্থিতি বদলে যায়। খুব সূক্ষ্ম অনুভূতি না হলে কেউ চিনতে পারবে না।’’
বলেই সে আবার চারপাশে তাকাল।
‘‘ভাই, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’’
চু ইয়ান কৌতূহলী হয়ে তাকাল।
এত ঘুরপাক, আবার পরিচয় বদল—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে সুন সিলি তাকে কোনো গোপন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন...