মূল পাঠ ত্রিশতম অধ্যায়: আত্মীয়স্বজন
চলে যাওয়ার আগে, কিনশা আবার মালিককে দিয়ে কয়েকটি পদ রান্না করিয়ে নিলেন, তিনি ভাবলেন, এগুলো নিয়ে গিয়ে তাঁর বাবা-মাকে খাওয়াবেন।
বাড়ি ফিরে এসে, কিনশা দেখলেন বাড়ির বাইরে একটি ছোট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মনে মনে ভাবলেন, এবার আবার কে এসেছে? সম্প্রতি কেন যেন তাঁর বাড়িতে এত ভিড় বাড়ছে? বার বার কেউ না কেউ তাঁদের বাড়িতে চলে আসে।
দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখলেন, ঘরে তিনজন নতুন লোক। এক মধ্যবয়সী দম্পতি এবং এক যুবক, যার বয়স কিনশার কাছাকাছি।
চোখের সামনে এই দম্পতিকে চিনতে অসুবিধা হল না কিনশার, এরা তাঁর আত্মীয়, পুরুষটি তাঁর বাবার ছোট ভাই, মানে কিনশার কাকু, আর মহিলাটি তাঁর কাকিমা।
তাহলে ওই যুবকটি নিশ্চয়ই তাঁর মামাতো ভাই—কিনমিং।
কিনশার স্মৃতিতে, এই আত্মীয়রা সব সময় তাঁর পরিবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে ভালোবাসত। একসময়, যখন কিনশা বাড়ি ছাড়েননি, কিনবাবা ও কিনমা-র ছিল সম্মানজনক চাকরি, তখন কিনশার কাকুর অবস্থা ভালো ছিল না বলেই প্রায়ই কিনবাবার কাছে টাকা চাইতেন, কিন্তু কখনও পরিশোধ করার নাম মুখে আনেননি।
কিনবাবা মন ভালো, ভেবেছেন, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে এসব হিসেবের কী আছে! তাই কখনও গায়ে মাখেননি।
আর কাকুর ছেলে—কিনমিং, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী, এটিই কাকুর একমাত্র গর্বের বিষয় ছিল। প্রতি বছর যখন সবাই একসঙ্গে জড়ো হতেন, তখন কিনশা আর কিনমিং-কে তুলনা করা হতো। তখন কিনশার পড়াশোনার ফল গড়পড়তা বলে, সবাই তাঁর সমালোচনা করত।
এত খোঁটা খেতে হতো তাঁকে।
কিনশা ফিরে আসার পরে, একদিন বাবার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারেন, কিনবাবা কিনশাকে খুঁজতে গিয়ে পাঁচ বছরে সব সঞ্চয় খরচ করে ফেলেছিলেন এবং পরে ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা চেয়েছিলেন, কিন্তু এক পয়সাও পাননি।
বাবার মুখে এই কথা শুনে কিনশা রাগে দাঁত চেপে ধরেছিলেন।
ভেবে দেখলে, কাকুরা এখনও তাঁদের অনেক টাকা দেন, ফেরত চায়নি ঠিকই, কিন্তু টাকা চাইলে একটুও দেন না—এত স্বার্থপর মানুষ জীবনে দেখেননি কিনশা।
আর যখন কিনশার পরিবার পতন করল, তখন থেকে দুই পরিবারের মধ্যে আর যোগাযোগ ছিল না।
কিনশা ভাবলেন, সম্পর্ক না থাকাই ভালো, এমন আত্মীয়দের তাঁর প্রয়োজন নেই।
কিন্তু এখন শুনছেন, তাঁর ফিরে আসার পরে আবার দুই পরিবারের যোগাযোগ শুরু হয়েছে।
কিনশা ঘরে ঢুকতেই, কাকু নানা কথা জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলেন, উদ্দেশ্য একটাই—তাঁকে খোঁটা দেওয়া।
কথা বলতে বলতেই, কাকু গর্ব করতে শুরু করলেন, ‘‘দেখো ছোটশা, তুমি ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলে না, আমার ছেলে কিনমিং কিন্তু এখন চুংহাই শহরের সেরা স্কুলে পড়ে। আর তুমি তো হাইস্কুলও শেষ করতে পারোনি, বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হয়েছ, গত দশ বছর তোমার কেমন কেটেছে জানিনে!’’
কাকুর মুখভঙ্গি দেখে কিনশার বমি পাচ্ছিল, তবু বাবা-মায়ের মুখ দেখে শান্তভাবে বললেন, ‘‘এই তো, মোটামুটি চলছিল, খুব ভালো না হলেও মন্দও না—আসলে বেঁচে আছি, সেটাই বড় কথা।’’
‘‘ওহে, শুনেছি এখন তুমি কোন ওষুধ কোম্পানিতে নিরাপত্তারক্ষী?’’
কিনশা বললেন, ‘‘জীবিকা চালানোর জন্যই তো, কাজ তো কাজই, যা-ই হোক।’’
আরও বলতে চাইলেন, আগের দিনে যখন তোমাদের টাকার অভাব ছিল, তখন তো তুমি সব ধরনের কাজই করতে! এখন তুমি নিরাপত্তারক্ষীকে ছোট করছ?
এসব মনেই বললেন, মুখে কিছু বললেন না, দেখছিলেন, কাকু আরও কী বলেন।
‘‘তোমাকে বলছি, বয়স কম হল না, বাবা-মায়েরও ভালো চাকরি নেই, তোমার উচিত একটা ভাল চাকরি খোঁজা, যাতে বাবা-মার অন্তত দুশ্চিন্তা না থাকে—’’
‘‘দ্যাখো, কিনমিং এখন বড় কোম্পানিতে কাজ করে, মাসে দশ হাজার টাকা বেতন, নিজের টাকায় গাড়ি কিনেছে, তুমি বাড়ি ফিরতে দেখেছ নিশ্চয়ই, বাইরের টয়োটাটা ওর, বিশ লাখের গাড়ি।’’
এতক্ষণে আসল কথায় এলেন!
কিনশা মনে মনে ঠাট্টা করলেন, এত বছর চাকরি করে বিশ লাখের গাড়ি কিনেছে, তাতে গর্বের কী আছে!
গাড়ির কথা উঠতেই পাশের কিনমিং গর্বে সোজা হয়ে বসল। ছোটবেলা থেকেই কিনশাকে সে অপছন্দ করত, যদিও কিনশা তাঁর দাদা, তবুও কেবল এক সপ্তাহ বড়, আর কোনো কিছুতেই সে তাঁর সমান নয়।
ভাবত, এমন গরিব আত্মীয় কিনশাদের পরিবারে কীভাবে হল।
কিনশা চুপ, ভাবলেন, নিশ্চয়ই তাঁর গর্বে কিনশা ভয় পেয়ে চুপ হয়ে গেছে।
আসলে কিনশার অবস্থা আজ এত খারাপ, ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
এই সময় চুপ করে থাকা কিনমিংও বলল, ‘‘দাদা, তোমার অবস্থা যখন এতটা খারাপ, চাও তো, তোমাকে আমাদের কোম্পানিতে নিয়ে যেতে পারি, বেতনও বেশি পাবে।’’
কিনশা হেসে বললেন, ‘‘তুমি তো মালিক নও, ইচ্ছা করলেই কাউকে চাকরি দেবে কীভাবে?’’
কিনমিং কিছু বলার আগেই তাঁর বাবা বললেন, ‘‘আমাদের কিনমিংয়ের কোম্পানির বড়কর্তা কিনমিংকে একটু পছন্দই করেন, ওরা যদি একসঙ্গে হয়, তাহলে কোম্পানি তো কিনমিংয়েরই হয়ে যাবে!’’
কিনশা জানতেন না, কিনমিং যে কোম্পানিতে কাজ করে, সেটিই শা-ওয়ের কোম্পানি, আর কিনমিং সেখানে কেবল ছোট একটি বিভাগের প্রধান মাত্র, কাজের সূত্রে কয়েকবার শা-ওয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাই সে মনে করে শা-ওয়ে ওকে পছন্দ করেন—সবই তার কল্পনা।
কাকু যত আজগুবি কথা বলছেন, কিনশা ততই চুপ করে রইলেন, দেখলেন তাঁরা কেমন গালগল্প করেন।
কিনবাবা দেখলেন কিনশার মুখে হাসি একটু কৃত্রিম, ভাবলেন, ছেলে হয়তো অপমানিত বোধ করছে, কিন্তু আসলে কিনশা তাঁদের না বোঝার দুঃখে হাসছেন, তাঁদের জন্য মায়াই হচ্ছে।
এখন কিনশার সামর্থ্যে, বিশ লাখের গাড়ি দূরের কথা, এক কোটি টাকার গাড়ি চাইলে, এক কথায় হাজার হাজার লোক লাইন দিয়ে দেবে, শুধু ‘‘চিন রাজা’’কে খুশি করতে, কিনশার এক টাকাও খরচ করতে হবে না।
কিনবাবা পরিবেশ সহজ করার জন্য বললেন, ‘‘ছোটশা, হাতে কী এনেছ?’’
তখন কিনশা মনে পড়ল, বাইরে থেকে আনা রান্না করা খাবারগুলো, বললেন, ‘‘ওগুলো বাইরে থেকে কিনে এনেছি।’’
দেখা গেল, সাধারণ কিছু ঘরোয়া খাবার, একেবারে সাধারণ।
কাকিমা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘‘এমন সাধারণ খাবার খাবে কেন! আমরা তো কিনমিংয়ের জন্য অনেক সামুদ্রিক মাছ এনেছি, আজ রাতের খাবারে ওগুলোই খাবো, এই সব খাবার খেয়ে পেটে সমস্যা হবে।’’
কিনবাবার মুখের দিকে না তাকালে, কিনশা এতক্ষণে খাবারগুলো তাঁদের মুখে ছুঁড়ে মারতেন।
এতটা পরিবার মিলে এসে তাঁর অপমান করছে, দু’টাকা পয়সা হাতে এসেছে বলে সকলকে তুচ্ছ ভাবছে?
একসময় তাঁদের পরিবার যখন দুঃসময় পার করছিল, কিনবাবা তো কম সাহায্য করেননি, এমনকি কিনমিংয়ের স্কুলের ফিসও কিনবাবা ধার দিয়েছিলেন।
তখন তো কিনবাবা কখনও তাঁদের অপমান করেননি।
‘‘ওহে, ছোটশা মন দিয়ে এনেছে, আমি তো সামুদ্রিক মাছ পছন্দ করি না, তোমরা খাও, আমি ছোটশা আনা খাবারই খাবো,’’ কিনবাবা খাবার হাতে নিয়ে হাসিমুখে বললেন।
ছেলের এই মনোভাবেই তিনি খুশি, তিনি চান না কিনশা বড় কিছু করুক, অন্য কেউ কত টাকা রোজগার করে সেটা তাঁদের বিষয়, তাঁর চাওয়া ছেলেটা সুস্থ ও নিরাপদে জীবন কাটাক, এটাই বড় প্রাপ্তি।